শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬
25.5 C
Dhaka

আরও পড়ুন

দেশে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা, অচল হবে যেসব ফোন

দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে টু-জি প্রযুক্তি বন্ধের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আগামী তিন বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে এ প্রযুক্তি সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু টু-জি সমর্থিত ফোনে প্রচলিত মোবাইল কল করা যাবে না। তবে ভোল্টি প্রযুক্তি সমর্থন করে এমন ফোরজি বাটন ফোনে আগের মতোই সরাসরি মোবাইল নম্বরে কল করা যাবে।

বিটিআরসির হিসাবে, দেশে বর্তমানে ৬ কোটি ১৩ লাখ টু-জি ফোন ব্যবহার করছেন গ্রাহকেরা। এসব ফোনের বেশির ভাগই ভোল্টি প্রযুক্তি সমর্থন করে না। ফলে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহককে বিকল্প ফোন ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে কম দামের বাটন ফোনের ওপর নির্ভরশীল গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

গত অক্টোবরে মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের একটি রোডম্যাপ তৈরি করে বিটিআরসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পর নতুন কোনো টু-জি হ্যান্ডসেটের মডেল অনুমোদন দেওয়া হবে না। এরপর ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের পর টু-জি ফোনের উৎপাদন এবং একই বছরের ৩০ জুনের পর এসব ফোনের বাজারজাতকরণ বন্ধ করার পরিকল্পনা রয়েছে। সবশেষে ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে টু-জি সেবা বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এ রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, পরিকল্পনার সময়সীমা ও পদক্ষেপগুলো এখনই চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলে যেসব ফোনে ফোরজি বা ভোল্টি ব্যবহারের সক্ষমতা নেই, সেগুলোতে প্রচলিত মোবাইল ভয়েস কল করা সম্ভব হবে না। তবে সব বাটন ফোন বন্ধ হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। ভোল্টি সমর্থিত ফোরজি বাটন ফোনেও সরাসরি মোবাইল নম্বরে কল করা যাবে।

ভোল্টি বা ভয়েস ওভার লং টার্ম ইভোলিউশন এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে ফোরজি বা এলটিই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ভয়েস কল করা যায়। এতে আলাদা কোনো ইন্টারনেটভিত্তিক কলিং অ্যাপের প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে হোয়াটসঅ্যাপের মতো অ্যাপ দিয়ে কল করতে হলে দুই পক্ষেরই সংশ্লিষ্ট অ্যাপ, ইন্টারনেট সংযোগ ও ডেটা ব্যবহারের সুযোগ থাকতে হয়।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ হলেও মানুষ মোবাইলে কথা বলতে পারবেন। তখন কল হবে ভোল্টি প্রযুক্তি অথবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো ওভার-দ্য-টপ (ওটিটি) অ্যাপের মাধ্যমে। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে বাজারে এমন ফোরজি বাটন ফোনও রয়েছে, যেগুলো ভোল্টি সমর্থন করে।

রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, যেসব হ্যান্ডসেট শুধু টু-জি সমর্থন করে, সেগুলোর উৎপাদন বন্ধের বিষয়ে নির্মাতাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, ধাপে ধাপে এসব ফোন বাজার থেকে সরে গেলে ২০৩০ সাল নাগাদ মানুষের হাতে টু-জি হ্যান্ডসেট থাকবে না। তখন ভয়েস কল ভোল্টি বা অ্যাপভিত্তিক ব্যবস্থায় হবে।

তবে টু-জি ফোনের বিকল্প হিসেবে সাশ্রয়ী হ্যান্ডসেটের ব্যবস্থা করা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমানে বাজারে প্রায় ৯০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে বাটন ফোন পাওয়া যায়। এসব ফোনে কল করার পাশাপাশি টর্চ লাইট, এফএম রেডিও এবং মেমোরি কার্ড থেকে গান শোনার সুবিধা থাকে। কোনো কোনো ফোনে সীমিত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে। অন্যদিকে স্মার্টফোনের দাম তুলনামূলক বেশি।

দেশের হ্যান্ডসেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিম্ফনির স্বত্বাধিকারী এডিসন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এমআইওএবি) সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, হ্যান্ডসেটের সঙ্গে ভয়েস ও ডেটা সুবিধা যুক্ত করে আকর্ষণীয় প্যাকেজ দেওয়া গেলে গ্রাহকদের ফোরজি ফোন ব্যবহারে আগ্রহ বাড়তে পারে। পাশাপাশি কিস্তিতে ফোন কেনার সুযোগ রাখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটর, হ্যান্ডসেট উৎপাদক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

সরকারের পক্ষ থেকেও কম দামে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীতে বাংলাদেশ টেককানেক্ট ২০২৬ সম্মেলনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভুঁঞা জানান, ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে প্রান্তিক মানুষের সংযোগ বাড়াতে দেশে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে কম দামে স্মার্টফোন বাজারে এলেই সব গ্রাহকের জন্য টু-জি থেকে ফোরজিতে যাওয়া সহজ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও প্রযুক্তিতে কম অভ্যস্ত অনেক মানুষ টাচস্ক্রিন ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। যাঁরা মূলত কথা বলা, রেডিও শোনা কিংবা টর্চ ব্যবহারের জন্য বাটন ফোন কেনেন, তাঁদের কাছে স্মার্টফোনের বাড়তি সুবিধার চেয়ে দাম ও সহজ ব্যবহারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তাই টু-জি নেটওয়ার্ক বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভোল্টি সমর্থিত সাশ্রয়ী বাটন ফোনের প্রাপ্যতা, কম দামের ফোরজি হ্যান্ডসেট এবং গ্রাহকদের নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here