শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬
29.6 C
Dhaka

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের রেলপথে ভারতীয় বেসরকারি ট্রেন চালানোর প্রস্তাব

বাংলাদেশের রেলপথ ব্যবহার করে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহনের সুযোগ চেয়েছে ভারত। দেশটির বেসরকারি কনটেইনার ট্রেন অপারেটরদের বাংলাদেশের রেলপথে সরাসরি ট্রেন পরিচালনার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ভারতীয় রেলওয়ে। পাশাপাশি তিনটি আন্তসীমান্ত রুটে ২৪ ঘণ্টা মালবাহী ট্রেন চালু, পণ্য পরিবহনে সরাসরি বুকিং এবং বাংলাদেশে ভারতীয় ট্রেন গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে ভারতের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের রেলপথে ট্রেন পরিচালনা করলে এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব ও দায়ভার ভারতীয় রেলওয়েকে নিতে হবে বলে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

গত ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও ভারতের ৩৮তম আন্তসরকারি রেল বৈঠকে (আইজিআরএম) এসব প্রস্তাব ও অবস্থান উঠে আসে। বৈঠকের কার্যবিবরণীতে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের আলোচনা, প্রস্তাব এবং সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ভারতের বেশ কয়েকটি প্রস্তাবের বিষয়ে বাংলাদেশ সরাসরি সম্মতি না দিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব ও কারিগরি তথ্য চেয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে।

বর্তমানে ভারতের সরকারি ও বেসরকারি কনটেইনারবাহী ট্রেনগুলো বেনাপোল সীমান্তের বিপরীতে ভারতীয় অংশ পর্যন্ত পণ্য নিয়ে আসে। এরপর কনটেইনার বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করলেও সেগুলো স্থানীয় ট্রেইলার ট্রাকের মাধ্যমে আইসিডি কিংবা নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানো হয়। ভারত এই ব্যবস্থার পরিবর্তে তাদের বেসরকারি কনটেইনার ট্রেন অপারেটরদের বাংলাদেশের রেলপথ ব্যবহার করে সরাসরি দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দিতে বলেছে।

তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ৩৭তম আন্তসরকারি রেল বৈঠকেও বাংলাদেশ জানিয়েছিল, ভারতের কোনো বেসরকারি কনটেইনার ট্রেন অপারেটরকে এ দেশের রেলপথে ট্রেন পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হলে তার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব ভারতীয় সরকারি রেলওয়েকে নিতে হবে। এবারের বৈঠকেও একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। বিষয়টি উপযুক্ত ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া দর্শনা-গেদে, পেট্রাপোল-বেনাপোল ও রোহনপুর-সিংহাবাদ রুটে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মালবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। বর্তমানে এসব রুটে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। ভারতের যুক্তি, সার্বক্ষণিক ট্রেন চলাচল চালু হলে সীমান্তে পণ্য পরিবহনের অপেক্ষার সময় কমবে এবং দুই দেশের বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে। বাংলাদেশ জানিয়েছে, গত দুই বছরে এসব রুটে পণ্য পরিবহন কমলেও সম্প্রতি তা বাড়তে শুরু করেছে। তাই আন্তসীমান্ত বাণিজ্যের পরিমাণ ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

রোহনপুর-সিংহাবাদ রুটে ভারতীয় মালবাহী ট্রেন গ্রহণের গতি বাড়ানোর বিষয়েও চাপ দিয়েছে ভারত। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশে ট্রেন গ্রহণে বিলম্ব হওয়ায় ভারতীয় ওয়াগন ও ইঞ্জিন দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। জবাবে বাংলাদেশ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের আগস্টে পাঁচটি আন্তবিনিময় পয়েন্ট দিয়ে মোট ৫৭টি রেক গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ইঞ্জিন, জনবল ও রেললাইনসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে রোহনপুর-সিংহাবাদ রুটে আরও বেশি ট্রেন গ্রহণ করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে বিকল্প আন্তবিনিময় পয়েন্ট ব্যবহার করে পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ।

পণ্য ওঠানো-নামানোর স্টেশনগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও বৈঠকে আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ জানিয়েছে, পশ্চিমাঞ্চলের ১২টি পণ্য খালাস স্টেশনে ক্লিয়ার স্ট্যান্ডিং লেংথ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ বাজার, ইব্রাহিমাবাদ, নওয়াপাড়া, ফরিদপুর ও উল্লাপাড়া স্টেশনের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। ভারতীয় ওয়াগনের ঘূর্ণনকাল পাঁচ দিনের নিচে নামিয়ে আনতে ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ও জনবল সমন্বয়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সীমান্তে পণ্যবাহী ট্রেনের অপেক্ষা কমাতে ভারতীয় স্টেশন থেকে বাংলাদেশের পণ্য স্টেশনে সরাসরি বুকিং চালুর প্রস্তাবও দিয়েছে ভারত। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্টেশনগুলোর ওয়াগন গ্রহণের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় নতুন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া সরাসরি বুকিং চালু করতে দুই দেশের রেল ট্রাফিক বিনিময়সংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধনের প্রয়োজন হবে। তাই আপাতত বর্তমান পুনর্বুকিং ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ।

বৈঠকে ভারতীয় ওয়াগনের বহনক্ষমতা বাড়ানো, বেনাপোলে ৪৫ ওয়াগনের পূর্ণদৈর্ঘ্যের কনটেইনার ট্রেন গ্রহণ এবং ওপেন টপ কনটেইনার চলাচলের অনুমতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ জানিয়েছে, বেনাপোলে পূর্ণদৈর্ঘ্যের ট্রেন গ্রহণ সম্ভব হলেও ওপেন টপ কনটেইনার থেকে পণ্য খালাসের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের সব রেলপথ, সেতু ও কালভার্ট অতিরিক্ত ভার বহনের উপযোগী নয়। ফলে নির্দিষ্ট রুটের কারিগরি সক্ষমতা যাচাই ছাড়া ওয়াগনের বহনক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নয়।

দুই দেশের রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের নিশ্চিন্তপুর পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন এবং ঢাকা থেকে নিশ্চিন্তপুর পর্যন্ত যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ভারতকে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের চাহিদার পূর্বাভাস ও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাতে বলেছে।

বৈঠকে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলসংযোগ প্রকল্পের ধীরগতির বিষয়টিও উঠে আসে। বাংলাদেশ এ জন্য ভারতীয় ঠিকাদারের আর্থিক সংকট, নির্মাণসামগ্রীর ঘাটতি ও ব্যয়সংক্রান্ত জটিলতাকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে ঠিকাদারের পাওনা ৪৫ কোটি টাকা ভ্যাট পরিশোধের অনুরোধ জানিয়েছে ভারত। দুই দেশের রেলওয়ের মধ্যে ওয়াগন ব্যবহারের পাওনা নিয়েও হিসাবের অমিল রয়েছে। ভারতের দাবি, ২০২৬ সালের জুনে তাদের পাওনা ৩৯০ কোটি ৯৯ লাখ রুপি। অন্যদিকে বাংলাদেশের হিসাবে ভারতীয় রেলওয়ের কাছে বাংলাদেশের নিট পাওনা ২১৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। বৈঠকে নিয়মিত হিসাব হালনাগাদ ও পাওনা সমন্বয়ে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ।

যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে বন্ধন এক্সপ্রেসে যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাস্টমস ও অভিবাসন সেবা চালু এবং পদ্মা সেতু দিয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। তবে পদ্মা সেতু দিয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালানোর বিষয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে বলেছে বাংলাদেশ। বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বন্ধ থাকা তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়টি ছিল না। পরবর্তী আন্তসরকারি রেল বৈঠক ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here