আয়কর রিটার্ন পূরণের সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো—কোন সময়ের আয় হিসাব করে রিটার্ন জমা দিতে হবে। অনেকেই করবর্ষ ও আয়বর্ষকে একই মনে করেন। ফলে কখনো আগের বছরের আয় বাদ পড়ে, আবার কখনো ভুল করে চলতি সময়ের আয়ও রিটার্নে যুক্ত হয়ে যায়।
সহজভাবে বললে, ২০২৬–২৭ করবর্ষের রিটার্নে সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাকে সাধারণত ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের আয় দেখাতে হবে। অর্থাৎ ২০২৬–২৭ করবর্ষের রিটার্নে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন আয়বর্ষের আয় নয়, তার আগের আয়বর্ষের আয় হিসাব করা হয়।
এখন করবর্ষ ও আয়বর্ষের পার্থক্য এবং কোন কোন আয়ের হিসাব এই রিটার্নে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা সহজভাবে জানা যাক।
করবর্ষ ও আয়বর্ষের পার্থক্য কী?
বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থায় করবর্ষ ও আয়বর্ষ আলাদা বিষয়। যে ১২ মাসে একজন ব্যক্তি আয় করেন, সেই সময়কে আয়বর্ষ বলা হয়। আর ওই আয় হিসাব করে যে পরবর্তী করবর্ষে কর নির্ধারণ ও রিটার্ন দাখিল করা হয়, সেটি করবর্ষ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সাধারণত ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কে আয়বর্ষ হিসেবে ধরা হয়। আয়বর্ষ শেষ হওয়ার পরবর্তী বছরটি হলো করবর্ষ। তাই ২০২৫–২৬ আয়বর্ষের আয় ২০২৬–২৭ করবর্ষে দেখাতে হবে।
২০২৬–২৭ করবর্ষের হিসাব এক নজরে
বিবরণ
তথ্য
আয় শুরুর তারিখ
১ জুলাই ২০২৫
আয় শেষের তারিখ
৩০ জুন ২০২৬
আয়বর্ষ
২০২৫–২৬
করবর্ষ
২০২৬–২৭
কোন কোন আয়ের হিসাব দেখাতে হবে?
২০২৬–২৭ করবর্ষের রিটার্নে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে অর্জিত বা আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মতো আয় দেখাতে হবে। একজন করদাতার একাধিক উৎস থেকে আয় থাকলে সব প্রযোজ্য আয়ের তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
চাকরি থেকে আয়: এই সময়ের মধ্যে চাকরি করে যে বেতন, বোনাস, উৎসব ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা পেয়েছেন, সেগুলোর প্রযোজ্য হিসাব রিটার্নে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বেতন সনদ বা অফিসের বার্ষিক আয় বিবরণী সংগ্রহ করলে হিসাব করা সহজ হবে।
ব্যবসা বা পেশা থেকে আয়: ব্যবসা, দোকান, অনলাইন ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, পরামর্শক সেবা, চিকিৎসা, আইন পেশা বা অন্য কোনো পেশাগত কাজ থেকে আয় হলে সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের হিসাব দেখাতে হবে। ব্যবসার ক্ষেত্রে শুধু মোট বিক্রির অঙ্ক দেখালেই হবে না; প্রযোজ্য ব্যয়, লাভ-লোকসান ও প্রয়োজনীয় হিসাবও প্রস্তুত রাখতে হবে।
বাড়ি বা সম্পত্তি ভাড়া থেকে আয়: বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান, অফিস বা অন্য কোনো সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে আয় করলে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ সময়ের প্রাসঙ্গিক ভাড়ার হিসাব দিতে হবে। ভাড়া চুক্তি, ব্যাংক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের কাগজপত্র সংরক্ষণ করা ভালো।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে আয়: ব্যাংক আমানতের সুদ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা, বিভিন্ন আর্থিক বিনিয়োগ থেকে আয় এবং প্রযোজ্য অন্যান্য প্রাপ্তির তথ্যও বিবেচনায় নিতে হবে। এসব আয়ের ক্ষেত্রে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া সনদ এবং উৎসে কর কর্তনের তথ্য সংগ্রহ করুন।
কৃষি ও অন্যান্য উৎসের আয়: কৃষিকাজ, জমি, সম্পদ বিক্রি, মূলধনি মুনাফা, রয়্যালটি বা অন্য কোনো উৎস থেকে আয় হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের নিয়ম অনুযায়ী তা রিটার্নে দেখাতে হবে। সব ধরনের আয় একই নিয়মে করযোগ্য নয়; কোনো আয় করমুক্ত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা বিশেষ হারে করযোগ্য কি না, তা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
১ জুলাই ২০২৬-এর পরের আয় কি এই রিটার্নে দেখাতে হবে?
সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৭ পর্যন্ত অর্জিত আয় ২০২৬–২৭ করবর্ষের রিটার্নে দেখানোর কথা নয়। এটি পরবর্তী ২০২৭–২৮ করবর্ষের আয়বর্ষের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে।
উদাহরণ হিসেবে, একজন চাকরিজীবী ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে চাকরি করছেন। তিনি ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক বেতন ও অন্যান্য আয় ২০২৬–২৭ করবর্ষের রিটার্নে দেখাবেন। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে পরবর্তী সময়ে পাওয়া বেতন সাধারণ নিয়মে পরের আয়বর্ষের হিসাবের অংশ হবে।
তবে কোনো অর্থের আয় কোন আয়বর্ষে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা শুধু ব্যাংকে টাকা জমার তারিখ দিয়ে সব ক্ষেত্রে নির্ধারিত হয় না। আয়ের ধরন, আয় অর্জনের সময়, প্রাপ্তির সময় এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান বিবেচনা করতে হয়।
সম্পদ ও দায়ের তথ্য কোন তারিখের ভিত্তিতে দেবেন?
আয়কর রিটার্নে শুধু আয় নয়, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পদ, দায় এবং ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যয়ের তথ্যও দিতে হয়। আয়বর্ষের আয় এবং নির্দিষ্ট তারিখে সম্পদের অবস্থান—এই দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
সাধারণভাবে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে আপনার হাতে থাকা নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালান্স, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, স্বর্ণালংকার এবং অন্যান্য সম্পদের প্রাসঙ্গিক তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে। একইভাবে ব্যাংকঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ বা অন্যান্য দায়ের তথ্যও প্রয়োজন হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে আপনি একটি মোটরসাইকেল কিনেছেন এবং ৩০ জুন ২০২৬ তারিখেও সেটি আপনার মালিকানায় রয়েছে। তাহলে সম্পদ বিবরণীতে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী সেটির তথ্য দিতে হবে। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টে নতুন কোনো সম্পদ কিনলে সেটি সাধারণত ২০২৬–২৭ করবর্ষের আয়বর্ষ শেষে থাকা সম্পদের বিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত হবে না।
রিটার্ন তৈরির আগে যেসব কাগজপত্র সংগ্রহ করবেন
রিটার্ন প্রস্তুত করার আগে সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের বেতন সনদ, ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, সঞ্চয়পত্র বা বিনিয়োগের সনদ, ব্যবসার আয়-ব্যয়ের হিসাব, বাড়িভাড়ার তথ্য, উৎসে কর কর্তনের সনদ এবং প্রযোজ্য অন্যান্য কাগজপত্র সংগ্রহ করুন। পাশাপাশি ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে থাকা সম্পদ ও দায়ের তথ্যও গুছিয়ে রাখুন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়া প্রতিটি টাকা নতুন আয় নয়। নিজের এক হিসাব থেকে অন্য হিসাবে টাকা স্থানান্তর, আগের সঞ্চয় ভাঙানো, ঋণের অর্থ গ্রহণ বা সম্পদ বিক্রির অর্থ—এসবের প্রকৃতি অনুযায়ী ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে। তাই ব্যাংক লেনদেনের সঙ্গে আয়ের হিসাব মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
প্রশ্ন: ২০২৬–২৭ করবর্ষের রিটার্নে কি ২০২৬ সালের পুরো বছরের আয় দেখাতে হবে?
উত্তর: না। সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত আয়বর্ষের হিসাব দেখাতে হবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের আয় এই আয়বর্ষের অন্তর্ভুক্ত নয়।
প্রশ্ন: ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের আয় কি এই রিটার্নে দেখাতে হবে?
উত্তর: সাধারণ নিয়মে না। ওই সময়ের আয় ২০২৪–২৫ আয়বর্ষের অংশ, যার করবর্ষ ২০২৫–২৬।
প্রশ্ন: ২০২৬ সালের জুনে চাকরি শুরু করলে কী হবে?
উত্তর: ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষে যে বেতন ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সুবিধা অর্জিত বা প্রাপ্ত হয়েছে, তা প্রযোজ্য নিয়মে হিসাব করতে হবে। চাকরি শুরুর তারিখ এবং বেতন বিবরণী মিলিয়ে দেখুন।
প্রশ্ন: ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বেতন পেলেও সেটি কি ২০২৬–২৭ করবর্ষে দেখাতে হবে?
উত্তর: শুধু বেতন পাওয়ার তারিখ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। বেতনটি কোন সময়ের কাজের বিপরীতে অর্জিত হয়েছে এবং আয়কর আইনে সেটি কোন আয়বর্ষে গণ্য হবে, তা যাচাই করতে হবে।
প্রশ্ন: কোম্পানির ক্ষেত্রেও কি একই সময়ের আয় দেখাতে হয়?
উত্তর: সব ক্ষেত্রে নয়। কোম্পানি বা বিশেষ হিসাববর্ষ অনুসরণকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আয়বর্ষ নির্ধারণে আলাদা বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। তাই এই লেখায় উল্লেখিত সময়সীমা মূলত সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার জন্য।
শেষ কথা
২০২৬–২৭ করবর্ষের রিটার্ন প্রস্তুত করার সময় মনে রাখতে হবে, সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার জন্য হিসাবের সময় হলো ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬। এই সময়ের বেতন, ব্যবসা, পেশা, বাড়িভাড়া, ব্যাংক ও অন্যান্য উৎসের প্রযোজ্য আয় সঠিকভাবে হিসাব করে রিটার্নে দেখাতে হবে। একই সঙ্গে ৩০ জুন ২০২৬ তারিখে থাকা সম্পদ ও দায়ের তথ্যও প্রস্তুত রাখতে হবে।
করবর্ষ ও আয়বর্ষের পার্থক্য বুঝে সঠিক সময়ের আয় দেখাতে পারলে রিটার্নে ভুল হওয়ার ঝুঁকি কমে। কোনো আয় কোন সময়ে গণ্য হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলে অনুমান করে তথ্য না দিয়ে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র ও আয়কর আইনের বিধান যাচাই করুন।
সরকারি তথ্যের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর FAQ এবং আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬–২০২৭ অনুসরণ করতে পারেন।




