নবীন আইনজীবীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানো এবং আইন পেশায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে একাধিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। এ লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দেশের প্রতিটি কোম্পানিতে অন্তত একজন আইনজীবী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল ৪টা ৩৮ মিনিটে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে ২০০৬ ব্যাচের আইনজীবীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান, ঢাকা আইনজীবী সমিতির বর্তমান ও সাবেক নেতৃবৃন্দ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং শিক্ষানবিশ ও নবীন আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে নবীন আইনজীবীদের পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য মেধা, সততা ও অধ্যবসায়ের ওপর গুরুত্ব দেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান থাকাকালে তিনি নিজেই দেখেছেন, কীভাবে কঠিন যাচাই-বাছাই ও স্বচ্ছ পরীক্ষাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে নবীন আইনজীবীরা উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের এই সাফল্যের পেছনে ব্যক্তিগত মেধা ও যোগ্যতাই প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
তদবিরের মাধ্যমে আইনজীবী হওয়ার সুযোগের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এখানে কোনো তদবির কাজ করেনি, কাজ করেছে নবীনদের নিজস্ব মেধা ও মনন। মেধার ভিত্তিতেই তাঁরা এই পর্যায়ে এসেছেন।
আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ার কঠিন দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, বার কাউন্সিলের মেধা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া বিসিএস পরীক্ষার চেয়েও কঠিন। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া নবীনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, ভালো আইনজীবী হতে হলে শর্টকাট পথ পরিহার করতে হবে। পেশাগত জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আইনের গভীর জ্ঞান অর্জন, নিয়মিত অধ্যয়ন, সততা ও দক্ষতার বিকল্প নেই। বিচারকের খাসকামরায় গিয়ে তদবিরের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা না করে আইন ও যুক্তির ভিত্তিতে নিজের অবস্থান তৈরি করার পরামর্শ দেন তিনি।
আইন পেশায় দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, নবীন আইনজীবীদের পেশাগত মানোন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। শুধু অর্থ বরাদ্দের মধ্যেই উদ্যোগ সীমাবদ্ধ থাকবে না; দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
আইনমন্ত্রী মনে করেন, আইন পেশায় প্রবেশের পর বাস্তব কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আদালতের কার্যক্রম, আইনি গবেষণা, মামলা পরিচালনা, যুক্তি উপস্থাপন এবং পেশাগত আচরণ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান নবীন আইনজীবীদের দক্ষ করে তুলতে পারে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ পেশার মান উন্নয়নের পাশাপাশি বিচারপ্রার্থীদেরও উপকৃত করতে পারে।
অনুষ্ঠানে দেশের জনসংখ্যার তুলনায় আইনজীবীর সংখ্যা নিয়েও কথা বলেন আইনমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশে বর্তমানে আইনজীবীর সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। এই সংখ্যাকে পর্যাপ্ত মনে করেন না তিনি। দেশের মানুষের আইনি সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে আইনজীবীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং পেশায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
এ লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানে অন্তত একজন আইনজীবী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার সম্ভাবনার কথা জানান আইনমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের বিধান চালু করা গেলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আইনজীবীদের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলোও তাদের ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় আইনি পরামর্শ ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনে কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সংশোধিত আইনের নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি। ফলে প্রতিটি কোম্পানিতে আইনজীবী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি আপাতত সরকারের পরিকল্পনা বা বিবেচনাধীন উদ্যোগ হিসেবেই রয়েছে।
আইন পেশায় নতুনদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে প্রশিক্ষণে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং কোম্পানিতে আইনজীবী নিয়োগের সম্ভাব্য বিধান চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আইন পেশার কর্মপরিধি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।




