
কলমে -সংকোচ
তাং ০৭–০৯–২০২৪
—————————–
ছোট্ট শহরের একটি ঘর। দরজার বাইরে বৃষ্টি, ভেতরে একটু শান্ত, কিন্তু সেই শান্ত পরিবেশে চাপা একটি অস্থিরতা রয়েছে। ঘরের এক কোণে বসে আছেন মেহেদি সাহেব। বৃদ্ধ বয়সের ছাপ স্পষ্ট, শরীর দুর্বল কিন্তু চোখে একটা অদ্ভুত আলো। সেই আলো কখনো গর্বের, কখনো বেদনার। তার সামনে বসে আছে দুই সন্তান—তারা আজ সফল, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে বাবার মুখে তৃপ্তির হাসি নেই।
মেহেদি সাহেব তার জীবন উৎসর্গ করেছেন সন্তানদের জন্য। ছোট বয়সে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে দিয়ে সন্তানদের বড় করার জন্য নিরলস পরিশ্রম করেছেন। তার মনে সবসময় একটাই কথা থাকত, “বাবারা কখনো গরিব হয় না, কারণ সন্তানের কাছে বাবা অমূল্য রতন।” কিন্তু এই রতন যেন এখন মূল্য হারিয়েছে। সন্তানরা বড় হয়েছে, নিজের জীবনে ব্যস্ত। বাবার প্রতি তাদের মনোযোগ নেই, একসময় যে বাবা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, সেই বাবাই এখন গুরুত্বহীন হয়ে উঠেছেন।
শুরুতে সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। সন্তানরা যখন ছোট ছিল, মেহেদি সাহেব দিনরাত খেটে তাদের পড়াশোনার জন্য অর্থ জোগাড় করতেন। সন্তানদের চোখের উজ্জ্বলতা ছিল তার জীবনের প্রেরণা। তিনি কখনো ভাবেননি তার সন্তানরা এমন হবে যে, বড় হয়ে তার সাথে দূরত্ব তৈরি করবে।
একদিন রাতে, তার বড় ছেলে নাহিদ এসে বলল, “বাবা, আপনি তো বুঝতে পারেন, এখন সবাই ব্যস্ত। আমরা অনেক কিছুই করতে পারি না আগের মতো। আপনার যত্ন নেওয়ার জন্য এত সময় আমাদের থাকে না।”
মেহেদি সাহেব স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এটা সেই ছেলে, যার জন্য তিনি দিনের পর দিন উপোস থেকে টাকা সঞ্চয় করেছিলেন, যাতে তার উচ্চশিক্ষার খরচ চালাতে পারেন। এখন সেই ছেলে বলে তার যত্ন নেওয়ার সময় নেই? তিনি মনে মনে বললেন, “কীভাবে একজন বাবা গুরুত্বহীন হয়ে যায়? সন্তানের জন্য নিজের সবকিছু উৎসর্গ করার পরও কেন বাবা যেন জীবনের শেষে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে?”
এভাবেই দিন কেটে যায়। ছোট ছেলে রাসেল একদিন এসে জানায়, “বাবা, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপনার জন্য একটা বৃদ্ধাশ্রম ভালো হবে। সেখানে আপনি নিজের মতো থাকতে পারবেন, আর আমরা কাজ নিয়ে চিন্তামুক্ত থাকতে পারব।”
মেহেদি সাহেবের বুকটা ধড়াস করে উঠল। বৃদ্ধাশ্রম? এটাই কি তার জীবনের শেষ ঠিকানা? সেই বাবা, যার হাত ধরে সন্তানের প্রথম হাঁটা, প্রথম শব্দ বলা, সেই বাবার জন্য বৃদ্ধাশ্রম?
একদিন মেহেদি সাহেব ছোট নাতনিকে কোলে নিয়ে বলছিলেন, “তুমি জানো, বাপ-বেটার সম্পর্ক এমন এক সম্পর্ক যেখানে ভালোবাসার কোনো হিসাব থাকে না। বাবারা সব কিছু দেয়, কিন্তু কখনো ফেরত চায় না। তবু কেন জানি সময়ের সাথে সাথে বাবাদের মলিন হয়ে যেতে হয়।”
নাতনি অবাক হয়ে বলে, “দাদু, বাবা-মায়েরা কি কখনো বদলে যায়?” মেহেদি সাহেব তার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। পরে বললেন, “সময় মানুষের চোখ খুলে দেয়, বুঝিয়ে দেয় জীবনের কঠিন বাস্তবতা। বাবারা কখনো বদলে যায় না, কিন্তু সমাজ, সময়, এবং ব্যক্তিগত চাহিদা বাবাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দেয়।”
ছোট্ট নাতনি বুঝতে পারল না। কিন্তু এই কথাগুলো যেন মেহেদি সাহেবের মনের গোপন কথাই ছিল। সন্তানের কাছে বাবা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সময়ের সাথে হারিয়ে যায়। যখন সন্তানরা ছোট থাকে, বাবার প্রয়োজন থাকে সব সময়। কিন্তু সন্তানদের বড় হওয়ার সাথে সাথে বাবারা যেন আর সেই প্রয়োজনীয়তা ধরে রাখতে পারেন না।
বাবার একটা বড় দায়িত্ব হলো সন্তানদের জীবন গড়ে দেওয়া। তবে সেই জীবন গড়ার সাথে সাথে বাবারও একটা জায়গা থাকা উচিত সন্তানদের মনে। বাবার প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি কষ্ট, প্রতিটি রাতের নির্ঘুম চোখ যেন একটা শিক্ষণীয় বার্তা। “বাবারা কখনো অপরাধী হয় না, তারা সব সময় ভালো কিছু করতে চায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সন্তানের কাছে তাদের মলিন হওয়া বড়ই দুর্ভাগ্যের।”
বাবাদের জীবনের গল্পগুলো যখন বলা হয়, তখন মনে হয় তারা অদম্য—পরিশ্রমী, সংগ্রামী। কিন্তু একটা সময় এসে সেই বাবারাই যেন পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বহীন ব্যক্তিতে পরিণত হন। অথচ বাবা তো সেই মানুষ, যিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সন্তানের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সন্তানদের জীবনের রঙিন স্বপ্নের পিছনে বাবার ঘামে ভেজা সেই ধূসর রঙ যেন কেউ আর দেখতে পায় না।
গল্পের শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, মেহেদি সাহেব এক বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। ছেলেমেয়েরা নিজেদের জীবনে ব্যস্ত, তারা হয়তো ভাবছে বাবাকে তারা নিরাপদ জায়গায় রেখেছে। কিন্তু সেই বৃদ্ধাশ্রমের ছোট ঘরে বসে মেহেদি সাহেব কেবল একটি কথাই ভাবছেন—“বাবারা গরিব হয় না, কারণ সন্তানের ভালোবাসাই তাদের ধন। কিন্তু যখন সেই ভালোবাসা শুকিয়ে যায়, তখন বাবার হৃদয়টাই হয় সবচেয়ে বড় ধনহীন সম্পদ।”
এই গল্পটি আমাদের শেখায়, সন্তানের জীবনে বাবার অবদান কখনো ম্লান হয় না। সময়ের সাথে বাবার গুরুত্ব হারানো উচিত নয়। বাবা অমূল্য, বাবা অপরাধী নয়। আমাদের উচিত সব সময় বাবাকে সেই সম্মান দেওয়া, যা তিনি তার কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জন করেছেন।
উক্তি:
১. “বাবারা কখনো গরিব হয় না, কারণ সন্তানের কাছে তারা অমূল্য রতন।”
২. “সময়ের সাথে বাবারা মলিন হয়ে গেলেও, তাদের ভালোবাসা কখনো ফুরিয়ে যায় না।”
৩. “বাবার জীবনের প্রতিটি ত্যাগই সন্তানের জন্য একটি মূল্যবান শিক্ষা।”